বিধান চন্দ্র গাঙ্গুলী, দুর্গাপুর : সরকারি নথিতে কার্যত ‘নিখোঁজ’, অথচ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন, এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এল সাম্প্রতিক এসআইআর ভোটার তালিকা প্রকাশের পর। খসড়া ভোটার তালিকায় নিজের নাম না দেখে হতবাক একাধিক ভোটার। বিষয়টি ঘিরে এলাকায় তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে দুর্গাপুর ১৪নং ওয়ার্ডের নতুনপল্লী এলাকায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে তাঁরা নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন। ভোটার কার্ড রয়েছে, আগের ভোটার তালিকায় নাম ছিল, বুথে গিয়ে ভোটও দিয়েছেন। অথচ এবারের এসআইআর তালিকায় হঠাৎ করেই তাদের নাম উধাও। সরকারি খাতায় যেন তারা অস্তিত্বহীন। ১৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাখি বটব্যাল, সঞ্জীব মান্ডি, শ্রাবণী মান্ডিরা জানান, নির্ধারিত সময়ে এনুমারেশন ফর্ম জমা দিয়ে সরকারি রিসিভ থাকা সত্ত্বেও খসড়া তালিকায় তাঁদের নামের পাশে লেখা নিখোঁজ। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই নাম একসঙ্গে বাদ পড়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পরিবারগুলির আশঙ্কা, নাম ফের অন্তর্ভুক্ত না হলে ভবিষ্যতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন তারা। সঞ্জীব মান্ডির অভিযোগ, “বিরাশি সাল থেকে তাঁরা এখানে আছেন। নিয়মিত ভোট দেন। মা, স্ত্রী ও নিজের এনুমারেশন ফর্ম নির্ধারিত সময়ে জমা করেছিলাম। খসড়া তালিকায় মায়ের নাম থাকলেও আমার আর স্ত্রীর নাম নেই। আতঙ্কে আছি।” সঞ্জীব মান্ডির স্ত্রী শ্রাবণী মান্ডির অভিযোগ, ” ফর্ম জমা দিয়েছি, প্রমাণ আছে। দুশ্চিন্তায় আছি আদেও নাম থাকবে কি না।” আরেক বাসিন্দা তাপস কুমার বটব্যাল অভিযোগ করেন, “ফর্ম সঠিক সময়ে বিএলও’কে জমা দিয়েছি এবং তার রিসিভ কপি আছে। এখন বিএলও কি করে বলছেন খুঁজে পাচ্ছিনা। সেটা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চরম ভোগান্তির খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের।” এই প্রসঙ্গে দুর্গাপুর নগর নিগমের প্রাক্তন পুরমাতা রাখি তেওয়ারি জানান, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ওয়ার্ডে যাদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের সাথে কথা বলেছি। তাঁদের দুশ্চিন্তা করতে মানা করেছি। আমরা তাদের পাশে আছি। তবে বিএলও’র গাফিলতি নাকি নির্বাচন কমিশনের গাফিলতি সেটা তদন্ত না করে বলা সম্ভব নয়।” যদিও এই ব্যাপারটিকে নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘরুই।

তিনি বলেন, “নাম কেন বাদ পড়ল সেটা বিএলও’রা বলতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন চায় স্বচ্ছভাবে ভোট হোক তাই এসআইআর করা হচ্ছে। নাম বাদ পড়লে পুনরায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফর্ম জমা যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন এখানকার বাসিন্দা হয়ে, ভোট দেওয়ার পরেও কেন নাম বাদ পড়ল তার কৈফিয়ত বিএলও’দের দিতে হবে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এসআইআর প্রক্রিয়ায় মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ব্যক্তি কিংবা দ্বৈত নাম বাদ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বহু সক্রিয় ভোটার এর আওতায় পড়ছেন। অভিযোগ উঠছে, ফর্ম জমা দেওয়া সত্ত্বেও বা যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনও ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তুলেছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। সেই অধিকার নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যাঁরা বছরের পর বছর ভোট দিয়ে এসেছেন, সরকারি নথিতে তারা কীভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে গেলেন? এসআইআর তালিকা ঘিরে এই ঘটনা রাজ্যজুড়ে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
