সংবাদদাতা , দুর্গাপুর: দুর্গাপুর আবারও সাক্ষী রইল এক চেনা দৃশ্যের, বৃহস্পতিবার দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার প্রধান গেটের সামনে চলে স্লোগান, পতাকা ও প্রতিবাদ। কেন্দ্রীয় ১০টি শ্রমিক সংগঠনের ডাকা দেশব্যাপী শিল্প ধর্মঘট শিল্পাঞ্চলের বুকে নতুন করে প্রশ্নের আগুন জ্বালিয়ে দিল।এখন প্রশ্ন একটাই, এই লড়াই কার জন্য? শ্রমিকের অধিকারের জন্য, না কি রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য?শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ গুরুতর। শ্রম আইন সংশোধনের নামে নাকি শ্রমিক সুরক্ষা খর্ব হচ্ছে। স্থায়ী নিয়োগের জায়গায় বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিকে ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যদি সত্যিই তাই হয়, তবে উদ্বেগের কারণ অস্বীকার করা যায় না। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কেবল উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, তা বহু পরিবারের রুটি-রুজির ভরসা, এক একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।

স্বপন মজুমদার যুগ্ম সম্পাদক হিন্দুস্থান স্টীল এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন একইসঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও তোলা প্রয়োজন, শিল্পের চাকা থামিয়ে কি সেই অধিকারের সুরক্ষা সম্ভব? উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত কে বইবে? বৃহৎ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কি এমন পথে হওয়া উচিত, যাতে স্থানীয় শ্রমিকেরই দিনের মজুরি বিপন্ন হয়?তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের পাল্টা বক্তব্যও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের দাবি,ধর্মঘট শিল্পের পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ায়, বিনিয়োগের বার্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে যেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র, সেখানে একদিনের স্থবিরতাও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।তবে এখানেই থেকে যায়। যদি শ্রমিকদের অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তবে কেন্দ্র কি তার নীতির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত? আর যদি অভিযোগে সত্যের ছায়া থাকে, তবে শ্রমিকদের ক্ষোভ কি অবাঞ্ছিত?শিল্পশহর দুর্গাপুরের ইতিহাস বলছে, সংগ্রাম ও উৎপাদন, দুই-ই এই শহরের পরিচয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে ভারসাম্যটাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নীতি সংস্কারের দাবি, অন্যদিকে জীবিকার নিশ্চয়তার প্রশ্ন।রাষ্ট্র কি শ্রমিকের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারছে?শ্রমিক সংগঠন কি আন্দোলনের ভাষাকে নতুন সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে?রাজনীতি কি শ্রমিকের কণ্ঠস্বরকে ব্যবহার করছে, না সত্যিই প্রতিনিধিত্ব করছে?কারখানার গেটের বাইরে প্রতিবাদের ভাষা যতই উচ্চকিত হোক, প্রকৃত সমাধান লুকিয়ে আছে নীতিনির্ধারণের টেবিলে সংলাপে, স্বচ্ছতায় ও পারস্পরিক আস্থায়।শিল্পশহর দুর্গাপুর আজ, আবার মনে করিয়ে দিলো শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পোন্নয়ন পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; সঠিক নীতিতে তারা পরস্পরের সহযাত্রী হতে পারে। প্রশ্ন কেবল, সেই পথ দেখাবে কে?
