গ্রাফাইট কারখানায় গরম পিচ বিস্ফোরনে ঝলসে গেলো জখম ৩ শ্রমিক

সংবাদদাতা দুর্গাপুর:- দুর্গাপুরের গ্রাফাইট কারখানায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয় তিন শ্রমিক । সোমবার দুপুরে গরম পিচ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কারখানায়। ঘটনার পরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কোকওভেন থানার পুলিশ।সূত্র মারফত খবর, ঘটনার সময় কারখানার নিচের অংশে কাজ করছিলেন অভিজিৎ ভুঁই, উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় এবং মৃণাল রায়। একই সময়ে ওপরের স্তরে চলছিল ওয়েল্ডিং-এর কাজ।
অভিযোগ, কোনও রকম নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সুরক্ষার জাল ছাড়াই একই সঙ্গে বিপজ্জনক দুটি কাজ চলছিল। আর সেই অব্যবস্থার ফলেই ঘটে বিপর্যয়। ওয়েল্ডিং-এর আগুন গরম পিচে পড়তেই ধেয়ে আসে আগুনের ঝলকানি, যার মধ্যে আটকা পড়ে অগ্নিদগ্ধ হন তিনজন শ্রমিক।


আহতদের বিধাননগরের একটি বেসরকারি মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তিনজনই আগুনে ঝলসে গেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক মৃণাল রায়কে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়েছে। চিকিৎসক তীর্থ মুখার্জী জানান, “তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে একজনের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। বাকি দুজনের শরীর আংশিক পুড়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে।”
এই ঘটনায় সিটুর জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য সিদ্ধার্থ বসু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাফাইট চলছে তৃণমূলের রাজ্য নেতাদের নির্দেশমতো। পুরো গ্রাফাইট আজ তৃণমূলের দখলে। ফলে গ্রাফাইটের ম্যানেজমেন্ট চুপ করে বসে আছে। এখানে বহিরাগত ঠিকা শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরিতে চুক্তিভিত্তিতে কাজ করানো হচ্ছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা ভাবাই হয়না। তাদের মানুষ বলেই মনে করা হয়না। ফলে কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতিতে এই ঘটনা ঘটেছে। এতে তিন শ্রমিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজনই বাঁকুড়ার বাসিন্দা। ম্যানেজমেন্ট ঘটনাটা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। শুধু এই প্রথমবার নয়, এর আগেও বহুবার এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।”এখন প্রশ্ন উঠছে, একই জায়গায় একই সময়ে কীভাবে ওয়েল্ডিং আর পিচের কাজ চলতে দেওয়া হলো? আগুন লাগার পর দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়নি কেন? কারখানার সুরক্ষা কমিটি থাকলে তাদের ভূমিকা কোথায়? নিয়মিত পরিদর্শন কি আদৌ হয়, নাকি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ? কারখানা কর্তৃপক্ষ নীরব থাকায় সন্দেহ আরও গভীর হচ্ছে।ঘটনার পরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক রেশ টানাটানি।তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য মানস অধিকারীর দাবি, “পাইপলাইনের কাজ করার সময় উপরের পুরোনো পিচ গলে গিয়ে নিচে কর্মরত শ্রমিকদের গায়ে এসে পড়ে। তিনজনই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আইএনটিটিইউসির সদস্যরা হাসপাতালে রয়েছেন। আমরা শ্রমিকদের পাশে আছি। তাদের চিকিৎসার জন্য সমস্তরকমভাবেই সাহায্য করবো।”
তবে ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহ সভাপতি চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “গ্রাফাইট ইন্ডিয়া লিমিটেডে কন্ট্রাক্টরের অধীনে যে সমস্ত শ্রমিকেরা কাজ করছেন তাদের নিরাপত্তা, সিকুরিটি, পেমেন্ট স্টেটাস কিছুই নেই। এখানে শ্রমিকদের জন্য কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, ফলে শ্রমিকেরা কখনো আগুনে পুড়ে যাচ্ছেন, কখনো ওপর থেকে পড়ে যাচ্ছেন, নানান দুর্ঘটনা ঘটছে। এই গ্রাফাইট ইন্ডিয়া লিমিটেড শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা দেয়, যার ফলে এর শ্রমিকদের স্বার্থে কোন কাজ করেনা।”
দুর্ঘটনা ঘিরে শ্রমিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দোষারোপও এখন তুঙ্গে।
গ্রাফাইট কারখানার এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ কতটা দৃঢ়?
একদিকে তিনজন শ্রমিক মৃত্যুর সাথে প্রাণপণ লড়াই করছেন। অন্যদিকে কারখানা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলির নীরবতা এবং পরস্পরের দিকে দোষ চাপানো আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *