বিধান চন্দ্র গাঙ্গুলী, দুর্গাপুর: দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল আবারও উত্তপ্ত। বেসরকারি কারখানায় শ্রমিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের দুই প্রাক্তন কাউন্সিলারের গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে রক্তাক্ত হল দুই কর্মী। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের এবিএল টাউনশিপ এলাকায় রবিবার রাত থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে।
আহত তৃণমূল কর্মী রঞ্জিত পন্ডিত জানান, “গতকাল ইউনিয়ন অফিসে এসআইআর এর শেষ মুহূর্তের কাজ নিয়ে একটা আলোচনা সভা ডাকা হয়। সেখানেই আমরা সবাই উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎই প্রাক্তন কাউন্সিলর দীপেন মাজির নেতৃত্বে কিছু বহিরাগত দুষ্কৃতী আমাদের উপরে হামলা চালায়। আমার গলায় সোনার চেন, টাকার ব্যাগ সব লুট করে পালায়। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। এই ঘটনাটি অত্যন্ত লজ্জার। আমরা একই দলের সদস্য হওয়ার পরেও কেন নিজের দলের লোকই আমাদের উপর হামলা চালালো। উচ্চতর নেতৃত্বকে বিষয়টি জানান হয়েছে। কিন্তু বোধগম্য হচ্ছেনা ইউনিয়নের কাজের ক্ষেত্রে প্রাক্তন কাউন্সিলর নাক গোলাচ্ছেন কেন?”
অভিযোগ, তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলার দীপেন মাজির নেতৃত্বে অনুগামীরা লাঠিসোটা নিয়ে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের দপ্তরে চড়াও হয়। মুহূর্তে তর্কাতর্কি চূড়ান্ত রূপ নেয় হাতাহাতিতে। গুরুতর জখম দুই কর্মীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতরা ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার দীপঙ্কর লাহার ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত।
অপর এক আহত তৃণমূল কর্মী বিকাশ দাশগুপ্ত জানান, “ইউনিয়ন কার্যালয়ে আলোচনা চলাকালীন প্রাক্তন কাউন্সিলর দীপেন মাজির নেতৃত্বে কিছু দুষ্কৃতী লাঠি, তরোয়াল নিয়ে এসে আচমকা আমাদের উপর হামলা চালায়। খুবই খারাপ লাগছে। এভাবে পার্টি করা যায়না।”

দুই পক্ষই পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছে থানায়। তবে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দীপেন মাজির দাবি, “এটি সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত অপপ্রচার এবং আক্রমণ করেছে বিপক্ষ গোষ্ঠীর লোকজনই। অপরদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ।”
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একই দলের দুই প্রাক্তন জনপ্রতিনিধির অনুগামীরা শ্রমিক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি রাস্তায় নেমে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়লেন কীভাবে? শ্রমিক সংগঠনের ভেতরে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে দানা বেঁধেছিল, তা কি শেষমেশ বিস্ফোরিত হল? দলের অন্দরের এই সংঘাতের জেরে শ্রমিক রাজনীতি কতটা অস্থিতিশীল হচ্ছে? তৃণমূলের জেলা শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য মানস অধিকারী অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,

“এগুলি কোনওভাবেই দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব নয়। কিন্তু পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রকে কি এত সহজে ধামাচাপা দেওয়া যায়?”এদিকে এই সুযোগেই সুর চড়িয়েছে বিরোধী দল। বিজেপি নেতা চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, “যেখানে নিজেদের কর্মীদেরই সামলাতে পারছে না শাসকদল, সেখানে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক স্বার্থ কে রক্ষা করবে?”এই ঘটনায় স্পষ্ট দলের ভেতরের অস্থিরতা ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট যে তার রেশ গিয়ে পড়ছে শ্রমিক নিয়োগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে। সামনে ভোট, তার আগে এই অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রশমনে তৃণমূল কতটা কঠোর হবে সেটাই এখন নজরে। কারণ একটাই দুর্গাপুরের শিল্পাঞ্চলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ যদি শ্রমিকস্বার্থকে চাপা দিয়ে দেয়, তবে এর দায় কে নেবে?
