বিধান চন্দ্র গাঙ্গুলী, দুর্গাপুর : অবশেষে জনরোষের সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হলো ডিভিসি (দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন) ও ডিটিপিএস (দুর্গাপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র) কর্তৃপক্ষ। শিল্প সম্প্রসারণের নামে বসতি উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ল। ঘটনাটি ঘটেছে দুর্গাপুর ৩৭ নং ওয়ার্ডের অর্জুনপুর তেঁতুলতলা ডাঙপাড়ায়। ঘটনার সূত্রপাত শনিবার সকালে। সূত্র মারফত খবর, শনিবার সাতসকালে ডিভিসি ও ডিটিপিএস কর্তৃপক্ষ বিশাল পুলিশ বাহিনী ও বুলডোজার নিয়ে অর্জুনপুর তেঁতুলতলা ডাঙপাড়া এলাকায় জমি দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করে। সবেমাত্র অভিযান শুরু হবে, এমন সময়ই আবির্ভাব ঘটল জনরোষের। বিনা নোটিশে সাতসকালে ডিভিসি ও ডিটিপিএস কর্তৃপক্ষের এহেন অকাল অভিযানে কার্যতই সহ্যের বাঁধ ভাঙে এলাকাবাসীর। মাথার ছাদ হারনোর দুঃস্বপ্নে গর্জে ওঠেন সকলে আর সেই তীব্র রোষানলের উত্তাপে টেকা দায় হয়ে পড়ে ডিভিসি ও ডিটিপিএস কর্তৃপক্ষের। শেষমেষ এলাকাবাসীদের দৃঢ় অবস্থান ও দুর্দমনীয় প্রতিবাদের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হন ডিভিসি ও ডিটিপিএস কর্তৃপক্ষ। এলাকাবাসীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানে বসবাস করে আসছেন। এখন হঠাৎ করে তাদের ঘর বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলে তারা যাবেন কোথায়? কোনও পুনর্বাসন ছাড়া এহেন ভূমি উচ্ছেদ বেআইনি ও অমানবিক।

এলাকাবাসী ছবি বাউরি জানান, “এর আগেও কর্তৃপক্ষ ভূমি উচ্ছেদ করে বাউন্ডারি দিয়ে দিয়েছিল। তখন আমরা এখানে এসে থাকি। এখন আবার এখান থেকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে। যখন বাউন্ডারি দেওয়ার ছিল তখনই দিতে পারতো, বার বার এভাবে হেনস্থা করার কি মানে? বার বার বাড়িঘর ভাঙলে আমরা কি করে থাকবো ? আমাদের পরিবার নেই ? অর্জুনপুরের কিছু অসাধু লোকের জন্যই এইসব হচ্ছে।” আরেক এলাকাবাসী বনলতা বাউরি জানান, “প্রথমবার যখন ভূমি উচ্ছেদ করতে এসেছিল তখন কর্তৃপক্ষের কথায় আমরা জায়গা ছেড়ে দিই আর এখানে এসে থাকতে শুরু করি। এখন আবার নতুন করে এখান থেকে সরে যেতে বলছে। তখনই তো বলতে পারত। আমরা এবার আর জমি ছাড়বনা।” সবার একটাই দাবি পুনর্বাসন ছাড়া ভূমি উচ্ছেদ কোনমতেই সম্ভব নয়। এই উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে একাধিক প্রশ্ন। প্রথমত, যদি শিল্প সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে এই উচ্ছেদ অভিযান হয়, তবে একেবারেই কেন উচ্ছেদ করছেন না কর্তৃপক্ষ? বারংবার তাঁদের মন মর্জি মতো উচ্ছেদ অভিযান কেন ? অর্জুনপুরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এর আগেও তাঁরা কর্তৃপক্ষের কথায় জমি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং কর্তৃপক্ষ তখন জমিতে বাউন্ডারি দিয়ে দিয়েছিল। তখন তাঁরা এখানে বসবাস শুরু করেন। তাহলে এখন আবার হঠাৎ করে কিসের উচ্ছেদ?

দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী যদি উচ্ছেদের পূর্বে পুনর্বাসন বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে ডিভিসি কর্তৃপক্ষের এহেন আচরণে মানে কি ? সত্যিই কি কিছুই জানেননা ডিভিসি কর্তৃপক্ষ নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই আইন অমান্য করার দুঃসাহসিকতা।তৃতীয়ত, উচ্ছেদ অভিযানের আগে অন্ততপক্ষে বাসিন্দাদের সে বিষয়ে অবগত করা উচিৎ, এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তা করেননি। তাহলে ভুল কার ? সবচেয়ে বড় কথা হল, শিল্প সম্প্রসারণ দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও আবশ্যিক, কিন্তু তা বলে কারোর মাথার ছাদ কেড়ে, পেটে লাথি মেরে, কারোর চোখের জলের দরদাম করে তা কোনমতেই উচিত নয়, এটা মানবতার হত্যা, মৌলিক অধিকারের উলঙ্ঘন। তবে কর্তৃপক্ষের সামনে এলাকাবাসীর এহেন অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদ স্মরণ করিয়ে দিল যে উন্নয়নে পুনর্বাসন নেই, মানবিকতা নেই, ন্যায়বিচার নেই

সেই উন্নয়নকে মানুষ সমূলে বর্জন করবে, প্রতিহত করবে এবং প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে। এদিনের জনতার দৃঢ় অবস্থান ডিভিসি’র ভিত যে খানিকটা নাড়িয়ে দিল তা বলাই বাহুল্য । মানুষ সংঘবদ্ধভাবে তার মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য সচেষ্ট হলে যেকোন বাধা বিপত্তিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে, আজকের ঘটনা সেটাই প্রমাণ করলো। স্বভাবতই এবার ডিভিসি কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নেয় সেটাই দেখার।
