মুক্তধারার ডানায় ভর করে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার আহ্বান

সংবাদদাতা , দুর্গাপুর : ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মুক্তধারা’ চলচ্চিত্রটির কথা মনে আছে? সংশোধনাগারের স্যাঁতসেঁতে, গুমোট কুঠুরির অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার বর্ণনা করা হয়েছিলো সেখানে। আসামীদের অপরাধ কবুল করানো, সত্য উৎঘাটনে থার্ড ডিগ্রি, শক থেরাপি শব্দগুলোর সাথে অল্পবিস্তর পরিচিত আমরা। কিন্তু কালচার‍্যাল থেরাপির কথা জানেন ক’জন ? শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বাতাবরণের মাধ্যমে আসামীদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার এক অন্যন্য প্রয়াস হল কালচার‍্যাল থেরাপি। সিনেমার রুপোলি পর্দা ছেড়ে এবার বাস্তবের মাটিতে মুক্তধারার অবতরণ ঘটল ইস্পাতনগরী দুর্গাপুরে। দুর্গাপুরের ফুলঝোরে মুক্ত সংশোধনাগারে মুক্তধারার সাক্ষী রইল সংশোধনাগারের আবাসিকেরা। মঙ্গলবার শীতের হিমেল সন্ধ্যায় নৃত্য, গীত, আবৃত্তি সহযোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের সুখ – দুঃখ, হাসি একে অপরের সাথে ভাগ করে নিলেন সংশোধনাগারের আবাসিকেরা। দীর্ঘদিন সংশোধনাগারের কঠোর পরিসরে নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ও সংশোধনের পথে হাঁটার পরই তাঁরা স্থান পান মুক্ত সংশোধনাগারে। সেই সংশোধিত জীবনবোধকে আরও সুদৃঢ় করে সমাজের মূলস্রোতে তাঁদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতেই দুর্গাপুর মহকুমা প্রশাসন ও দুর্গাপুর উপ সংশোধনাগারের যৌথ উদ্যোগে এদিনের এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দুর্গাপুর মুক্ত সংশোধনাগারের এক আবাসিক সোমনাথ মিস্ত্রি জানান, “২০০৬ সালে ফুটবল খেলার সময় এক সঙ্গী মারা যায়। সেই কেসে আমি দোষী সাব্যস্ত হই এবং তারপর থেকেই আমি জেলের সাজাপ্রাপ্ত আসামী। এরপর ২০১৯ সালে আমাকে দুর্গাপুরের মুক্ত সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। মিহির দাসের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলেছি। বর্তমানে আমি র‍্যাপিডোতে কাজ করি। এখানকার সব আবাসিকেরাই কেউ টোটো চালায়, তো কেউ সবজি, মাছ বিক্রি করে। সকাল ৬ টায় আমরা সংশোধনাগার থেকে বেরই এবং সারাদিন কাজ করে আবার রাত ৮ টায় সংশোধনাগারে ফিরে আসি। প্রতি ছ’মাসে আমাদের ১৫ দিনের ছুটি দেওয়া হয়।” আরেক আবাসিক সূর্য গোলদার জানান, “আমি ১৯ বছর ধরে সংশোধনাগারে আছি। আগে দমদম সেন্ট্রাল জেলে ছিলাম। বিগত ৫ বছর দুর্গাপুরের মুক্ত সংশোধনাগারে আছি। এখানকার জেলার খুব ভালো। উনিই আমাদের অভিভাবক। আমাদের সব সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রাখেন তিনি।”


দুর্গাপুর ফুলঝোড় উপ সংশোধনাগারের নিয়ামক তথা আধিকারিক পুলক কুমার মন্ডল জানান, “এই মুক্ত সংশোধনাগারে মোট ৯০ জন আবাসিক রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সংশোধনাগার থেকে আবাসিকেরা এখানে রয়েছেন, যারা সাজাপ্রাপ্ত আসামী। ভালো ব্যবহার ও আচরণের জন্য পুনরায় সমাজের মূলস্রোতে ফেরার একটা সুযোগ করে দিতেই এই মুক্ত সংশোধনাগার। সমাজে বিভিন্ন আনন্দনুষ্ঠান হলেও নিয়মের বেড়াজালে সেই অনুষ্ঠানে এরা অংশগ্রহণ করতে পারেননা। তাই এদের কথা ভেবেই মহকুমাশাসককে বিষয়টি জানাই। তাঁর উদ্যোগে আজকের এই অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এখানকার আবাদিকেরা আনন্দ একে অপরের সাথে ভাগ করে নিলেন।” এই মুক্ত সংশোধনাগার শুধু শাস্তির পরিসর নয়, আত্মনির্ভরতার এক কঠোর বিদ্যালয়। এখানে থাকা আবাসিকদের নিজেদের জীবিকা নিজেদেরই গড়ে নিতে হয় তাই কেউ টোটো চালিয়ে, কেউ সবজি বা মাছ বিক্রি করে, কেউ আবার র‍্যাপিডোতে মোটরসাইকেল চালিয়ে রুজি-রোজগার করেন। সরকার তাঁদের থাকার ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেও দৈনন্দিন আহারের খরচ বহনের দায় তাঁদের নিজেদের কাঁধেই। এই বাস্তবতা একদিকে যেমন দায়িত্ববোধ শেখায়, তেমনই শ্রমের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনে আত্মসম্মান। সংস্কৃতির অনুশীলন ও জীবিকার সংগ্রাম, এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই মুক্ত সংশোধনাগারের আবাসিকেরা ধীরে ধীরে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার যোগ্যতা অর্জন করছেন।
এই মুক্তধারা জেলের উঁচু প্রাচীরের ওপারের অন্ধকার জগৎ থেকে সমাজের মুক্ত আলোয় এসে জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার এই অন্যন্য উদ্যোগ সংশোধনাগারের আবাসিকদের মনে নতুন করে প্রাণ খুলে বাঁচার রসদ জুগিয়েছে শুধু তাই নয়, কালচার‍্যাল থেরাপির মাধ্যমে সংশোধনাগারের আবাসিকদের সুপ্ত শৈল্পিক সত্ত্বার উদ্ভাবন করেছে তা বলাই বাহুল্য। এককথায় এই মুক্তধারা সমাজে বার্তা দেয় শাস্তিই অপরাধ দমনের একমাত্র পাথেয় নয়, বরং সৃজনশীলতার মাধ্যমেও অপরাধ দমন সম্ভব এবং এটি প্রমাণ করে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতাই পারে মানুষকে নতুন করে গড়ে তুলতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *