সংবাদদাতা , দুর্গাপুর:— দু’দশক ধরে যাঁকে নিজের পরিবারেরই একজন বলে ভেবেছিলেন একা থাকা এক বৃদ্ধা। সেই মানুষটিই কি ছিলেন সর্বনাশের নেপথ্য কারিগর? বিশ্বাস, নির্ভরতা আর নিরাপত্তার আবরণে ঢাকা একটি সংসারে যে এমন নিঃশব্দে চুরি গড়ে উঠতে পারে, তা কি আগে কল্পনা করা যেত?
দুর্গাপুরের ফরিদপুর ফাঁড়ি এলাকার ৫৪ ফুট অঞ্চলের এক বৃদ্ধার বাড়িতে ঘটে যাওয়া চুরির ঘটনায় পুলিশি তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক তথ্য। বাইরের কোনও দুষ্কৃতীর হানা নয়, বরং ঘরের ভিতর থেকেই তৈরি হয়েছিল পুরো ছক, এমনই ইঙ্গিত মিলেছে তদন্তে।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর। বাড়ি থেকে গয়না ও নগদ টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ জানিয়ে থানার দ্বারস্থ হন ওই বৃদ্ধা। অভিযোগ পাওয়ার পরই আইসি ফরিদপুর ও ওসি দুর্গাপুরের নেতৃত্বে তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হতে থাকে এই চুরি ছিল পরিচিত হাতের কাজ।
পুলিশি জালে ধরা পড়ে সঞ্জয় ওঝা ও তাঁর ভাই শিবনাথ ওঝা। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সঞ্জয় ওঝা প্রায় কুড়ি বছর ধরে ওই বৃদ্ধার বাড়িতে বিশ্বস্ত গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। দিনের পর দিন সংসারের চাবি ছিল তার হাতেই। সেই দীর্ঘদিনের আস্থা, নির্ভরতা আর নিরাপত্তার অনুভূতিকেই ঢাল করে চুরির ছক কষে সে, এমনটাই তদন্তে উঠে এসেছে।পুলিশ অভিযুক্তদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে চুরি যাওয়া সমস্ত সোনা-রুপোর অলংকার এবং নগদ ২৪ হাজার টাকা। উদ্ধার হওয়া গয়নার আনুমানিক বাজারমূল্য লক্ষাধিক টাকা। কিন্তু তদন্ত চলাকালীন ঘটনায় আসে আরও ভয়ঙ্কর মোড়। শিবনাথ ওঝার কাছ থেকে একটি দেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ। ফলে চুরির পাশাপাশি অস্ত্র আইনে পৃথক মামলাও রুজু হয়েছে।ধৃত দু’জনেরই বাড়ি ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলায়। বর্তমানে দুর্গাপুরে বসবাস করছিল বলেই পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এই মুহূর্তে দু’জনই পুলিশি হেফাজতে। শুক্রবার বিকেলে দুর্গাপুর থানায় সাংবাদিক বৈঠক করে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার অভিষেক গুপ্তা জানান,”অভিযুক্তদের জেরা করে চুরির সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”এই সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এসিপি দুর্গাপুর সুবীর রায়, সিআই রণবীর বাগ সহ অন্যান্য পুলিশ আধিকারিকরা।বিশ্বাস যদি সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়, তবে বিশ্বাসঘাতকতাই সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ। এই ঘটনা শুধু একটি চুরি নয়,এ সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ঘরের মানুষ ভেবে যাদের হাতে তুলে দিই নিরাপত্তার চাবি, তারা আদৌ কতটা নির্ভরযোগ্য? উত্তর খুঁজতে এখন পুলিশের জেরা, আর সমাজের আত্মসমীক্ষা দু’টিই জরুরি।
