বিধান চন্দ্র গাঙ্গুলী, দুর্গাপুর : ফের বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগের অভিযোগ। নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ যেন পিছুই ছাড়ছেনা তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের। এবার দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় ভিনরাজ্যের শ্রমিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ উগরে দিলেন গোপালমাঠ ভূমিরক্ষা কমিটির সদস্যরা। অভিযোগ, দুর্গাপুরে কারখানা গড়ার জন্য নিজেদের জমি ছেড়েছিলেন যাঁরা, আজ তাঁদেরই বংশধর ভূমিপুত্ররা কারখানায় ব্রাত্য। কিন্তু দিনের পর দিন সেই কারখানায় বহিরাগত শ্রমিকদের নিয়োগ করা হচ্ছে। গোপালমাঠ ভূমিরক্ষা কমিটির সভাপতি ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “আমাদের পূর্বপুরুষরা শিল্পের খাতিরে নিজেদের জমি ছেড়েছেন।

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সেই ভূমিপুত্রদের পরিবার থেকে একজনকে কারখানায় কর্মে নিযুক্ত করা হবে। কিন্তু আজও সেই ভূমিপুত্ররা ব্রাত্য। কারখানায় কাজ পাননি। অথচ সেই কারখানায় দিনের পর দিন ভিনরাজ্যের বহিরাগত শ্রমিককে নিয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি স্থায়ী শ্রমিকদের অর্ধেক বেতন কেটে নেওয়া হয়। পুরো বেতন চাইলে কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া হয়। আসলে নিয়োগ দুর্নীতির টাকা তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটির সদস্যদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায়।” তিনি আরোও জানান, “কারখানার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত পার্থ মুখার্জী, বান্টি মহান্ত, বিশ্বনাথ গড়াই, রাজেশ্বর যাদব, তুহিন দে – এরা সকলেই বহিরাগত, কেউ পুরুলিয়া, কেউ বাঁকুড়া, কেউ বিহারের বাসিন্দা। নতুন কোর কমিটি গঠনের পর ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, কারখানায় কর্মে নিযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন স্থানীয়রা। তাহলে কোন জাদুকাঠিতে বহিরাগত শ্রমিকদের কারখানায় কর্মে নিয়োগ করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করব এর জবাব দিন।” মঙ্গলবার ভূমিরক্ষা কমিটির সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি পাঠিয়ে সরাসরি অভিযোগ তোলেন, “যদি তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটি সত্যিই শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, তবে এভাবে রাতারাতি বহিরাগত শ্রমিক কারখানায় নিয়োগ হচ্ছে কিভাবে?” ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, “যদি অবিলম্বে এই নিয়োগ দুর্নীতি বন্ধ না হয় তবে আগামীতে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন।” এই অভিযোগের পরেই সুর চড়াতে শুরু করেন বিরোধীরা। সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহ সভাপতি চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কারখানার গেটে গেটে টোল ফ্রি নম্বর বিলি করা হয়, বড় বড় ব্যানার লাগানো হয়, ঘোষণা করা হয় কর্মসাথি পোর্টালের মাধ্যমে কারখানায় কর্মে নিয়োগ হবে এবং স্থানীয়রা কাজে অগ্রাধিকার পাবেন, কিন্তু আদতে সবটাই ভাঁওতাবাজি। আসলে মোটা টাকার বিনিময়ে কারখানায় ভিনরাজ্য, ভিন জেলার শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে আর স্থানীয়রা চাকরি পাচ্ছেনা, এমনকি তৃণমূলের কর্মীরাই চাকরি পাচ্ছেননা। কোর কমিটি নয় বরং চোর কমিটি গড়ে উঠেছে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।” অন্যদিকে এর প্রত্যুত্তরে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য মানস অধিকারী জানান, “ভূমিরক্ষা কমিটির ট্রেড ইউনিয়নগতভাবে কোন অস্তিত্ব নেই। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতেই নিজেকে হাইলাইট করা। আর শ্রমিকদের জন্য যদি এই প্রতিবাদ হয়, তবে তাদের পাশে একজন শ্রমিককেও কেন দেখা যাচ্ছেনা। আর মুখ্যমন্ত্রীকে যে চিঠি পাঠিয়েছেন তার প্রমাণ কই। আর যিনি কোর কমিটিকে চোর কমিটি বলছেন তাঁর কর্মকান্ডের ইতিহাস সারা দুর্গাপুরবাসী জানেন। কোর কমিটি কখনই কোন কর্মী নিয়োগ করেনা। কোর কমিটি বরাবরই শ্রমিকদের স্বার্থে শ্রমিকদের পাশে ছিল, আছে, থাকবে। আর যে নিয়োগে কজনের নাম করা হয়েছে তার তদন্ত করা হবে।” এর পরেও কিন্তু একটা প্রশ্ন বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে, তা হল, বার বার কেনই বা বহিরাগত শ্রমিক কারখানায় কর্মে নিযুক্ত হচ্ছে এবং কার আশীর্বাদে? কার ইঙ্গিতে চলছে এই নিয়োগের অন্ধকার বাণিজ্য? দুর্গাপুরের ভূমিপুত্ররা কি শুধুই প্রতিশ্রুতির পাতায়, আর চাকরির আসল খাতায় কি তবে বহিরাগতদের নাম?কেনই বা একই অভিযোগে বার বার জর্জরিত হচ্ছে কোর কমিটি? অভিযোগ-প্রতিউত্তরের এই দড়ি টানাটানিতে একটাই সত্য স্পষ্ট, কারখানার ভিতরে কিছু একটা পচছে, আর সেই পচন ঢাকতে চাইছে অনেকেই। কবেই বা মিলবে এর জবাব সেদিকেই তাকিয়ে ইস্পতনগরী।
