বিধান চন্দ্র গাঙ্গুলী, দুর্গাপুর:— ছোটবেলায় জুজুর নাম শুনলেই ঘুম ছুটত বাচ্চাদের। কিন্তু বর্তমানে এই জুজু বাচ্চাদের ছেড়ে কাবু করেছে বড়দের। আর এই জুজুর নাম শুনেই ঘুম ছুটেছে বড়দের। এই জুজুর নাম হল এসআইআর। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এই জুজু আবার ভোটার লিস্ট থেকে আস্ত নামই ডিলিট করে দিচ্ছে। না কোন কাল্পনিক ঘটনা নয়। এই ঘটনার চাক্ষুষ প্রমাণ মিলল ইস্পাতনগরী দুর্গাপুরে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে দুর্গাপুর ১৪ নং ওয়ার্ডের ওল্ড কোর্টে ২০০২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন রঞ্জিত দে ও মুন্নি দে। অথচ এসআইআর ২০২৫ সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় দেখা গেল এক অদ্ভুত তথ্য, নামের পাশে লেখা ‘ডিলিট’। তালিকায় নাম আছে, অথচ সেই নাম বাতিল! এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা এই দম্পতি। হাতে এখনো পর্যন্ত এসআইআর ফর্ম না পাওয়ায় তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না কোন পথে গেলে মিলবে সমাধান। সবচেয়ে বড় ভয় এই ভুলচুক তাঁদের নাগরিক পরিচয়, নানান সরকারি নথি, এমনকি ভবিষ্যতের সুবিধাগুলোর ওপরও কি কোনও প্রভাব ফেলবে? নির্বাচনী ব্যবস্থায় এত বড় গলদ কীভাবে ঘটল, সেই প্রশ্ন এখন তাঁদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। অভিযোগকারী রঞ্জিত দের আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, “এসআইআর ফর্ম না পাওয়ায় বিএলও’র কাছে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি এসআইআর ২০২৫ সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় আমার এবং আমার স্ত্রীর নাম নেই। অথচ ২০০২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভোট দিয়েছি। ২০০২ সালে ভোটার লিস্টে নাম ছিল। এখন কি করব ভেবে রাতের ঘুম উড়ে গেছে। দেশের নাগরিকত্ব কি হারাতে হবে?” তাঁর স্ত্রী মুন্নি দের আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে জানান, “তাঁদের অনুমতি ছাড়াই কে বা কারা এই সিদ্ধান্ত নিল, এর দায় নেবে কে, কোথায় গিয়ে তাঁরা অভিযোগ জানাবেন। ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।” ঘটনাটি সামনে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে দুর্গাপুর জুড়ে। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত আসতে শুরু করেছে। দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ চন্দ্র ঘোড়ুই নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান এবং শাসক দলকে একহাত নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, “তৃণমূলের চিৎকার করার কিছু নেই, কারণ রাজ্যের শাসন ব্যবস্থার গলদেই এমন ভুলচুক তৈরি হয়েছে।” অন্যদিকে জেলা তৃণমূলের মুখপাত্র উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় পাল্টা জবাবে জানান, “নির্বাচন কমিশন ভারত সরকারের অধিনস্ত, বলা চলে বিজেপির দোসর। ডিলিট তো আমাদের লোকে করবেনা, নির্বাচন কমিশনের লোক করবে। কারণ, লিস্টে নাম ঢোকানো, নাম কাটানো সবটাই নির্বাচন কমিশনের লোকেই করবে। এই কথাগুলো তিনি শুভেন্দুবাবুর কাছে বললেন না কেন যখন তিনি নির্বাচন কমিশনের অফিসে গিয়েছিলেন।” এই ঘটনা কিছু প্রশ্নের উদ্রেগ ঘটাচ্ছে, যেমন
যাদের ভোটার তালিকায় নাম ছিল, যারা বছরের পর বছর ভোট দিয়ে আসছেন, তাদের নাম হঠাৎ করে ডিলিট হল কীভাবে? কারা এই নাম কেটে দেওয়ার ক্ষমতা পেল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি কোনও যাচাই বাছাই ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নিল? নাকি প্রযুক্তিগত ভুলের আড়ালে আরও কোন বড় গলদ চাপা পড়ে আছে? প্রশাসন কি জানেননা, ভোটার পরিচয় হারালে মানুষের নানান সরকারি সুবিধা, নথি এবং পরিচয় কাঠামো ঝুলে যেতে পারে? নাগরিকত্ব হারাতে পারেন তারা। যদিও রাজনীতির মানদণ্ডে বরাবরই জনতার সেবকেরা, জনতার ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠান করে। হাস্যকর ব্যাপার হল, দেশের উন্নয়নের জন্য কর দিয়ে যান, দেশের সুদিনের জন্য টাকা তুলতে ব্যাঙ্কের বাইরে লম্বা লাইন দিয়ে যান, নিজেরই কষ্টার্জিত টাকা তুলতে কর দিয়ে যান, সরকার গড়তে তপ্ত গরমে লম্বা লাইনে সেদ্ধ হয়ে ভোট দিয়ে যান, কিন্তু তাতেও আপনি দেশবাসী সেটা প্রমাণিত হয়না। কারণ ভোট দিলেও আপনার নাম সংশোধন তালিকায় ডিলিট হয়ে যেতে পারে। আপনি বেঁচে আছেন, আবার আপনার অস্তিত্বেই প্রশ্নচিহ্ন।
সমস্যার কেন্দ্রে থাকা দে দম্পতির সংকটের সমাধান এখনো অন্ধকারে ঢাকা। তালিকায় নাম থেকে গেলেও ‘ডিলিট’ শব্দটির উপস্থিতি তাঁদের ভোটাধিকার ও নাগরিক পরিচয়কে অস্তিত্বহীন করে তুলেছে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়, এটি গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। দীর্ঘদিন ভোট দেওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কীভাবে? কোন ভুল , কোন অসতর্কতা বা কার ইঙ্গিতে তালিকায় এমন পরিবর্তন ঘটল? আর এর সর্বশেষ দায়ভারই বা নেবে কে? রাষ্ট্র যাকে ভোটার বলে চিহ্নিত করেছে, সে হঠাৎই যদি ‘ডিলিট’ হয়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কতটা সুরক্ষিত?
ভূতকালে ভোটারলিস্টে নাম থাকলেও বর্তমানে ডিলিট
