সংবাদদাতা , দুর্গাপুর :২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গেছে। আর সেই মহারণের আগে দুর্গাপুর পশ্চিমে নিজেদের জমি শক্ত করতে ময়দানে নেমে পড়ল গেরুয়া শিবির। রবিবার দুর্গাপুর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের চুয়ান্ন ফুটের ক্ষুদিরাম মাঠে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলীয় কর্মীদের সাথে নিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর ‘রাষ্ট্রীয় বয়শ্রী যোজনা’ শিবিরের আয়োজন করলেন দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই। শিবিরে ৭০০-র বেশি বিশেষভাবে সক্ষম প্রবীণ নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া হয় হুইল চেয়ার, লাঠি, ঘাড়ের বেল্ট, কানের মেশিন-সহ একাধিক সহায়ক সামগ্রী। কার্যত এক ঢিলে দুই পাখি, একদিকে কেন্দ্রের প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, আর অন্যদিকে নির্বাচনের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা করার কৌশলে দুর্গাপুরের ভোটের রাজনীতির হাওয়া উত্তপ্ত করা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই জানান, “বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রবীণ মানুষকেই তাঁদের ঘরের লোক দেখভাল করেন না। তাই তাঁদের পাশে দাঁড়াতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বিশেষভাবে সক্ষম প্রবীণ নাগরিকদের হাতে হুইল চেয়ার, ট্রাই সাইকেল, কানের মেশিন সহ একাধিক সহায়ক সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে। ২৭ টি ওয়ার্ডের প্রবীণ মানুষেরা যাঁরা আসতে পারেননি, তাঁদের বাড়িতে গিয়ে নিজে সহায়ক সামগ্রী দিয়ে আসবো।”

উল্লেখ্য, শনিবার সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করে বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ ভট্টাচার্য তিনি জানিয়েছিলেন লক্ষণ ঘড়ুইকে প্রার্থী করা হলে তিনি নির্দল হয়ে লড়বেন। একদিকে বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সরঞ্জাম বিলি করে নিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর মরণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁরই জেলা সভাপতি অভিজিৎ ভট্টাচার্য খোদ বিধায়কের বিরুদ্ধেই ‘দুর্নীতির যম’ সেজে যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। এই বিষয়ে বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই বলেন “মূর্খ না শোনে ধর্মের কাহিনী। আমি ইতিমধ্যেই ডিএম অফিসে গিয়ে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার কাজ অনুমোদন করিয়েছি, ডিএসপির কাছ থেকে চুয়ান্ন ফুট আনন্দপুরিতে ৩৫ লক্ষ টাকার ড্রেন অনুমোদন করিয়েছি, ১৪ জন দুঃস্থ মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ২৫ হাজার টাকা দামের সেলাই মেশিন দিয়েছি, এম্বুলেন্স এনেছি, ৩৫ টা মন্দির সংস্কার করেছি, নানান কর্মসূচির মাধ্যমে এক কোটি মানুষকে পরিষেবা দিয়েছি। তাই মানুষই বলবে আমি কাজ করেছি কিনা। কে কি বলল তাতে কিছু যাই আসে না।” অন্যদিকে এই ঘটনাকে “মরণকালে হরিনাম” বলে কটাক্ষ করেছেন জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি উত্তম মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, “লক্ষণ ঘড়ুই বলছেন উনি এক কোটি মানুষকে পরিষেবা দিয়েছেন, কিন্তু উনার তো ভোটার সংখ্যাই তো ২ লক্ষের নিচে। এসব মিথ্যে কথা বলে বুলি আওড়ে কোন লাভ নেই। এতদিন কোথায় ছিলেন আপনাকে খুঁজেই পাওয়া যেতনা। শুধুমাত্র দলীয় নেতৃত্ব এলে তাঁদের পাশে পাশে চলতেন। এখন মানুষকে হুইল চেয়ার দিয়ে কি হবে। মানুষের পাশে থাকুন, পরজন্মে কাজে লাগবে। কারণ বিজেপি শেষ, তাই তিনিও শেষ।”
যদিও নিন্দুকেরা প্রশ্ন করতে ছাড়েননি, যিনি গত পাঁচ বছরে এলাকায় উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে পারেননি, তিনি নির্বাচনের আগে ট্রাই সাইকেলের চাকায় চড়ে কি বৈতরণী পার হতে পারবেন? নির্বাচনের ঠিক মাস কয়েক আগে কেন এই তৎপরতা? লাঠি বা কানের মেশিন কি মানুষের ক্ষোভ ধামাচাপা দিতে পারবে? বিজেপির জেলা সভাপতির তোলা অভিযোগ কি কেন্দ্রীয় অনুদানের এই ছোট উপহার দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব? এই সহায়তা কি নিছক মানবিক উদ্যোগ, নাকি নির্বাচনী কৌশলের অঙ্গ? বয়শ্রী যোজনার এই বৃহৎ আয়োজন কি আদেও ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলতে পারবে? ক্ষুদিরাম মাঠের এই দান-খয়রাত কি দলের ভেতরের আগ্নেয়গিরিকে শান্ত করতে পারবে? নাকি অভিজিৎ ভট্টাচার্যের ‘নির্দল’ হুমকিই হতে চলেছে লক্ষণ ঘড়ুইয়ের কফিনের শেষ পেরেক? উত্তর দেবে সময়, তবে আপাতত ‘পদ্ম-পুরাণের’ এই কোন্দল বেশ উপভোগ করছেন শিল্পাচলবাসী ।
